সংকট-সংগ্রাম, দুর্যোগ-দুর্বিপাকে অবিচল এক নারীর প্রতিকৃতি : বঙ্গমাতা বেগম মুজিব - Life style of Mithila

Last Writings

সংকট-সংগ্রাম, দুর্যোগ-দুর্বিপাকে অবিচল এক নারীর প্রতিকৃতি : বঙ্গমাতা বেগম মুজিব


 প্রারম্ভিকা:

‘সারা জীবন তুমি সংগ্রাম করেছ, তুমি জেল জুলুম অত্যাচার সহ্য করেছ, তুমি জানো যে এ দেশের মানুষের জন্য কী চাই, তোমার থেকে বেশি কেউ জানে না, তোমার মনে যে কথা আসবে তুমি শুধু সেই কথাই বলবে, কারো কথা শুনতে হবে না। তুমি নিজেই জানো তোমাকে কী বলতে হবে। তোমার মনে যে কথা আসবে তুমি সে কথাই বলবা।’ যে মহীয়সী নারীর এমন দৃঢ়প্রত্যয় সাহস জোগানোর ফলে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সেদিন ৭ই মার্চের অমর ভাষণ দিয়েছিলেন, বাঙালি জাতিকে মুক্তির পথ দেখিয়েছিলেন, ৭ই মার্চের ভাষণের নেপথ্য শক্তিতিনি বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন্নেছা রেনু। স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সহধর্মিণী ফজিলাতুন্নেছা মুজিব আমৃত্যু স্বামীর পাশে থেকে একজন যোগ্য ও বিশ্বস্ত সহচর হিসেবে দেশ ও জাতি গঠনে অসামান্য অবদান রেখে গেছেন। বঙ্গমাতা ফজিলাতুন্নেছা রেনু। এক মহীয়সী নারীর প্রতিকৃতি। তিনি ছিলেন স্বামী জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর প্রেরণা ও আত্মবিশ্বাসের উৎস। বঙ্গমাতাকে ছাড়া বঙ্গবন্ধুর পক্ষে গোটা জীবনে এত সাহসী সিদ্ধান্ত নেয়া সম্ভব হতো না। বঙ্গমাতাকে ছাড়া বঙ্গবন্ধু ছিলেন অসম্পূর্ণ। বঙ্গমাতাকে পাশে পেয়েই বঙ্গবন্ধু পূর্ণতা পেয়েছেন। বঙ্গবন্ধুর প্রতিটি সিদ্ধান্ত গ্রহণে প্রেরণা দানের পাশাপাশি এ দেশের সুদীর্ঘ সংগ্রামের ফসল আমাদের স্বাধীনতার ইতিহাসে এক অনন্য ভূমিকা রেখেছিলেন। বাংলার ইতিহাসে জাতির সংগ্রামী নেতৃত্ব সৃষ্টিতে নীরবে-নেপথ্যে অনবদ্য ভূমিকা রেখেছেন বঙ্গমাতা।

প্রাথমিক জীবন:

তিনি ১৯৩০ সালে গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় জন্মগ্রহণ করেন। তার ডাকনাম ছিল রেনু। তার পিতার নাম শেখ জহুরুল হক ও মাতার নাম হোসনে আরা বেগম। পাঁচ বছর বয়সে তার পিতা-মাতা মারা যান। তিনি তার স্বামী শেখ মুজিবুর রহমানের চাচাতো বোন ছিলেন। শেখ মুজিবের বয়স যখন ১৩ ও বেগম ফজিলাতুন্নেসার বয়স যখন মাত্র তিন, তখন পরিবারের বড়রা তাদের বিয়ে ঠিক করেন। ১৯৩৮ সালে বিয়ে হবার সময় রেনুর বয়স ছিল ৮ বছর ও শেখ মুজিবের ১৮ বছর। পরে এই দম্পতির দুই কন্যা ও তিন ছেলে হয়। তারা হলেন শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা এবং শেখ কামাল, শেখ জামাল ও শেখ রাসেল।

প্রাথমিক জীবনে নিজের লেখাপড়া বেশিদূর না এগোলেও স্বামীর শিক্ষার ব্যাপারে তাঁর নজর ছিল অতন্দ্র। বঙ্গবন্ধু লিখেছেন “কলকাতা যাব, পরীক্ষাও নিকটবর্তী। লেখাপড়া তো মোটেই করি না। ভাবলাম কিছুদিন লেখাপড়া করব। মাহিনা বাকি পড়েছিল, টাকা-পয়সার অভাবে। রেণুর কাছে আমার অবস্থা প্রথমে জানালাম। আব্বাকে বললে তিনি অসন্তুষ্ট হলেন মনে হলো। কিছুই বললেন না। টাকা দিয়ে আব্বা বললেন, ‘কোনো কিছুই শুনতে চাই না। বিএ পাস ভালোভাবে করতে হবে। অনেক সময় নষ্ট করেছ, ‘পাকিস্তানের আন্দোলন’ বলে কিছুই বলি নাই। এখন কিছুদিন লেখাপড়া কর।’ আব্বা-মা, ভাই-বোনদের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে রেণুর ঘরে এলাম বিদায় নিতে। দেখি কিছু টাকা হাতে করে দাঁড়িয়ে আছে। ‘অমঙ্গল অশ্রুজল’ বোধ হয় অনেক কষ্টে বন্ধ করে রেখেছে। বলল, ‘একবার কলকাতা গেলে আর আসতে চাও না। এবার কলেজ ছুটি হলেই বাড়ি এসো।’” প্রয়োজনে নিজের জমির ধান বিক্রির টাকা দিয়ে তিনি নিয়মিত স্বামীকে সহযোগিতা করে গেছেন। স্বামীর পাশে থেকে মানবতার জন্য কাজ করে গেছেন। জীবনে ঝুঁকি নিয়েছেন বহুবার। আড়াল থেকেই তিনি বাংলার মানুষের সেবা করে গেছেন আজীবন।

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় বেগম ফজিলাতুন্নেসা পরিবারের অন্য সদস্যদের (শেখ হাসিনা, শেখ জামাল, শেখ রেহানা, শেখ রাসেল, এম এ ওয়াজেদ মিয়া এবং অন্যান্য) সাথে মগবাজার অথবা কাছাকাছি কোনো এলাকার এক ফ্ল্যাট থেকে পাকিস্তান সেনাবাহিনী কর্তৃক গ্রেফতার হয়েছিলেনে ১২ মে ১৯৭১ এবং ধানমন্ডির বাড়ি ২৬, সড়ক ৯এ (পুরনো ১৮) তে বন্দি অবস্থায় ছিলেন ১৭ ডিসেম্বর পর্যন্ত।

 

যেভাবে সংকট-সংগ্রাম হাল ধরেছেন:

বঙ্গমাতা নিজের গহনা বিক্রি করে ছাত্রলীগের সম্মেলনে টাকা দিয়েছেন। ছাত্রনেতা আব্দুর রাজ্জাক ও তোফায়েল আহমেদসহ অন্যান্য ছাত্রনেতাদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রেখে বঙ্গবন্ধুর অনুপস্থিতিতে অর্থ ও পরামর্শ দিয়ে দলকে পরিচালনা করতেন। আব্দুর রাজ্জাকের একটি লেখায় পড়েছি- আওয়ামী লীগের অফিসের ভাড়া এবং তাঁর নিজের বাসার ভাড়া দেওয়ার আর্থিক সামর্থ্য না থাকার কারণে বঙ্গমাতা- অফিসের ভাড়া এবং মরহুম রাজ্জাক সাহেবের বাড়ি ভাড়ার টাকাও বঙ্গমাতা জুগিয়েছেন। বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক জীবনে দুইটি ঐতিহাসিক ঘটনার সঙ্গে বঙ্গমাতা ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিলেন। ১৯৬৮ সালে পাকিস্তান সরকার কর্তৃক আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় বঙ্গবন্ধুকে প্রধান আসামী করে ৩৫ জনের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহী মামলা দায়ের করা হয়। এমনকি বেগম মুজিবকে গ্রেফতার করার হুমকিও দেয়া হয়। সে সময় বঙ্গবন্ধুসহ অন্যান্য রাজবন্দিদের মুক্তির জন্য তীব্র আন্দোলন সংঘটিত হয়। পাকিস্তান সরকার বঙ্গবন্ধুকে প্যারোলে মুক্তি দিয়ে লাহোরে গোলটেবিল বৈঠকে আমন্ত্রণ জানায়। বেগম মুজিব জেলখানায় বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে দেখা করে প্যারোলে মুক্তি নেয়ার ব্যাপারে তীব্র আপত্তি জানান। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন পাকিস্তান সরকার বঙ্গবন্ধুকে মুক্তি দিতে বাধ্য হবে। সত্যি সত্যিই গণ-আন্দোলন গণ-অভ্যুত্থানে পরিণত হয় এবং পাকিস্তান সরকার বঙ্গবন্ধুকে মুক্তি দিতে বাধ্য হয়। ১৯৬৯ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি বঙ্গবন্ধু মুক্তি লাভ করেন। পরের দিন অর্থাৎ ২৩ ফেব্রুয়ারি বাঙালি তাদের প্রিয় নেতাকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধি দিয়ে বরণ করে নেয়। সে সময় ছাত্রলীগের সভাপতি ছিলেন জনাব তোফায়েল আহমেদ। তোফায়েল আহমেদের মুখে প্রথম উচ্চারিত হয়েছিলো ‘বঙ্গবন্ধু’। সেই থেকে শেখ মুজিব বাঙালির দেয়া খেতাব বঙ্গবন্ধু-তে পরিণত হন। বেগম মুজিব প্যারোলে মুক্তির ব্যাপারে জোড়ালো আপত্তি না করলে পাকিস্তানিরা বঙ্গবন্ধুকে মুক্তি দিতে বাধ্য হতো না।

দুর্যোগ-দুর্বিপাকে অবিচল বঙ্গমাতা:

আমরা প্রায় সবাই ঐতিহাসিক ৭ই মার্চের বঙ্গবন্ধুর ভাষণের কথা জানি। রাজনৈতিকভাবে বঙ্গবন্ধুর উপর স্বাধীনতা ঘোষণার একটি চাপ ছিলো, অন্যদিকে পাকিস্তান সরকারের কড়া দৃষ্টি ছিলো। আমরা অনেকেই জানি সেই ৭ই মার্চে রেসকোর্স ময়দানে মাথার উপর সুসজ্জিত হেলিকপ্টার ঘুরছে, আর মঞ্চের চারপাশে সাদা পোশাকে পাকিস্তানী আর্মি বঙ্গবন্ধুর উপর মানসিক চাপ সৃষ্টি করছে। সকল বাঙালি স্বাধীনতার ঘোষণা চেয়েছিলো। অথচ বঙ্গবন্ধু তখন স্বাধীনতার ডাক দিলে বিচ্ছিন্নতাবাদী নেতা হিসেবে সারা বিশ্বে পরিচিত হতেন। এমন একটি সময় বেগম মুজিব স্বাধীনতার ঘোষণা দেয়ার জন্য কোন চাপ সৃষ্টি করেননি। বেগম মুজিব জনতার মুখের দিকে তাকিয়ে এবং সার্বিক পরিস্থিতি মূল্যায়ন করে মন থেকে যা বলতে ইচ্ছা করেতাই বলার পরামর্শ দিয়েছিলেন। তাঁর পরামর্শের যথার্থ প্রতিফলন দেখা যায় ঐতিহাসিক এ ভাষণে। বঙ্গমাতা উল্লিখিত দু’টি ঘটনায় প্রত্যক্ষ অবদান যদি না রাখতেন, সেক্ষেত্রে বাংলাদেশের ইতিহাস অন্যরকম হতে পারতো। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে যে অবদান- সেখানে বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছার সহযোগিতা অত্যন্ত প্রশংসনীয়।

৬৬ এর ৫ ফেব্রুয়ারি, বঙ্গবন্ধু বাঙ্গালীর মুক্তির সনদ ছয় দফা ঘোষণা করেন। ৮ মে, নারায়নগঞ্জে ছয়দফার সমর্থনে জনসভা করে ঘরে ফেরার পর গভীর রাতে গ্রেফতার হন। ঐ সময় ছয়দফা না আটদফা বিভ্রান্তিতে অনেক নেতাও আটদফার পক্ষে কথা বলেন। ছয়দফা থেকে একচুলও নড়া যাবে না- বঙ্গবন্ধুর এই নির্দেশ বাস্তবায়নে বঙ্গমাতা ঐতিহাসিক ভূমিকা রাখেন।ছয়দফার সমর্থনে বোরকা পরে জনসংযোগ করেন।

৬৮ সালের ৩ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু ও চৌত্রিশ নেতার বিরুদ্ধে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা দায়ের করা হয়। বঙ্গবন্ধু কোথায় আছেন, বেঁচে আছেন কিনা এই খবর প্রায় পাঁচ মাস অজানা ছিল। সেনাবাহিনীর এক ক্যাপ্টেন যখন বঙ্গমাতাকে জিজ্ঞাসাবাদ করতে এলো, জানা গেলো তিনি ক্যান্টনমেন্টের অফিসার্স মেসের একটি কক্ষে বন্দী, সেখানে কোন বাতাস নেই, একটি বাল্ব জ্বলে, দিন রাত বুঝা যায় না। জিজ্ঞাসাবাদে কোন তথ্য না পেয়ে ক্যাপ্টেন হুমকি দেয় প্রয়োজনে বঙ্গমাতাকে গ্রেফতার করা হবে। তিনি ভয় পাওয়ার মানুষ নন। ঐ সময় প্রতিটি বন্দী পরিবারের নিয়মিত খোঁজ-খবর নেন ও সহযোগিতা করেন, মামলা পরিচালনার জন্য প্রবাসী বাঙ্গালীদের সহায়তায় লন্ডন থেকে আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন আইনজীবী স্যার টমাস উইলিয়ামকে ঢাকায় নিয়ে আসেন।

 

বঙ্গমাতার দূরদর্শিতা:

বঙ্গমাতার দূরদর্শিতা বাংলাদেশের স্বাধীনতারপথ খুলে দিয়েছিল। কন্যা শেখ হাসিনার উদ্ধৃতি, “পাকিস্তান সরকার আম্মাকে ভয় দেখায়, বঙ্গবন্ধু প্যারোলে মুক্তি না নিলে তিনি বিধবা হবেন। মা সোজা বলে দিলেন, কোন প্যারোলে মুক্তি হবেনা। নি:শর্ত মুক্তি না দিলে কোন মুক্তি হবেনা। আমি মায়ের সিদ্ধান্তের কথা বঙ্গবন্ধুকে যখন জানালাম তখন অনেক আওয়ামীলীগ নেতাকে ও দেখেছি আমাকে বলতে, তুমি কেমন মেয়ে? বাবার মুক্তি চাওনা? আম্মাকে বলেছে, ভাবী আপনি কিন্তু বিধবা হবেন....।” লেখক সৈয়দ বদরুল আহসান, From Rebel to Founding Father: Sheikh Mujibur Rahman গ্রন্থে উল্লেখ করেনঃ She passed on the message to Mujib--- Mujib listened to his wife. He did not give any thought to freedom on parole anymore.” বঙ্গবন্ধু যদি প্যারোলে যেতেন বাংলাদেশ স্বাধীন হতোনা। বঙ্গমাতার বিচক্ষণতা স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে ধ্রুবতারার মত।

পৃথিবীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ ভাষণ ৭১ এর ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু প্রদান করেছিলেন, যে ভাষণ বুকে নিয়ে নিরস্ত্র বাঙ্গালী সশস্ত্র হয়েছিল, রক্ত দিয়ে স্বাধীনতার লাল সূর্য ছিনিয়ে এনেছিল। কেমন ছিলো সেই ভাষণ প্রদানের প্রেক্ষাপট? কি ভূমিকা ছিল সেখানে বঙ্গমাতার? কন্যা শেখ হাসিনার স্মৃতিচারন মূলক এক বক্তব্যে পেয়েছি সন্ধান-“জনসভায় যাওয়ার কিছুক্ষণ পূর্বে আব্বা কাপড় পড়ে তৈরি হবেন, মা আব্বাকে নিয়ে ঘরে এলেন। দরজাটা বন্ধ করে দিয়ে আব্বাকে বললেন ১৫ মিনিট চুপচাপ শুয়ে থাকার জন্য। আমি আব্বার মাথার কাছে বসে মাথা টিপে দিচ্ছিলাম। মা বেতের মোড়াটা টেনে আব্বার কাছে বসলেন। যে কোন বড় সভায় বা গুরুত্বপূর্ণ কাজে যাওয়ার আগে আমার মা আব্বাকে কিছুক্ষণ একদম নিরিবিলি রাখতেন। মা আব্বাকে বললেন, সমগ্র দেশের মানুষ তোমার মুখের দিকে তাকিয়ে আছে। তোমার মনে যে কথা আসে তুমি তাই বলবে। অনেকে অনেক কথা বলতে বলেছে। তোমার কথার উপর সামনের অগণিত মানুষের ভাগ্য জড়িত। ”বঙ্গমাতার প্রেরণা থেকে রাজনীতির কবিগণ সূর্য্যরে মঞ্চ কাঁপিয়ে শুনিয়েছিলেন স্বাধীনতার অমোঘ মন্ত্র, ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’

 

সংগ্রামী বঙ্গমাতা:

৭১ এর ২৫মার্চ, দিবাগত রাতে বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন।বত্রিশ নম্বর বাড়ী আক্রমন করে বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতার করে নিয়ে যায় পাকিস্তানী সেনারা, বঙ্গমাতা ছেলেমেয়ে নিয়ে প্রথমে পাশের বাসায় আশ্রয় নেন। বত্রিশ নম্বর বাড়ী তছনছ করে, টুঙ্গিপাড়ায় বঙ্গবন্ধুর মা বাবার সামনে বাড়ী আগুনে পুড়িয়ে দেয়। বড় ছেলে শেখ কামাল ২৫ মার্চ রাতেই মুক্তিযুদ্ধে যান, আটক অবস্থায় শেখ জামাল ও যান।উনিশবার জায়গা বদল করেও রেহাই পেলেন না, একদিন মগবাজারের বাড়ী থেকে ছেলে-মেয়ে সহ বঙ্গমাতাকে গ্রেফতার করে ধানমন্ডির ১৮ নম্বর রোডের একটি বাড়ীতে রাখে পাকিসেনারা, বঙ্গবন্ধু বেঁচে আছেন কিনা জানতেন না। বন্দি অবস্থায় কন্যা শেখ হাসিনার সন্তান জন্ম নেয়ার সময় তাঁকে একবারের জন্যও ঢাকা মেডিক্যালে যেতে দেয়া হয়নি। কনিষ্ঠা কন্যা শেখ রেহানা ‘একজন আদর্শ মায়ের প্রতিকৃতি’ লেখায় এ প্রসঙ্গে বলেছেন,“জুলাই মাসের শেষ দিকে হাসু আপা হাসপাতালে গেল। মা যাওয়ার জন্য তৈরি হয়েও যেতে পারলেন না। সৈন্যরা তাকে যেতে দিলনা। বলল, ‘তুমি কি নার্স না ডাক্তার যে সেখানে যাবে’ মা খুব কষ্ট পেয়ে সারারাত কেঁদেছিলেন।” বন্দি অবস্থায় তিনি অসুস্থ্য শ্বশুর-শ্বাশুড়ীর চিকিৎসার ব্যবস্থা করান তৎকালীন পিজি হাসপাতালে (যা বর্তমানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়), সেখানে মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে সাক্ষাৎ করতেন, খবরাখবর আদান প্রদান করতেন।

তাঁদের যুদ্ধ দিনের বন্দীদশার অবসান ঘটে ১৭ ডিসেম্বর। মুক্তি পেয়ে বঙ্গমাতা বাড়ির ছাদ থেকে পাকিস্তানের পতাকা নামিয়ে টুকরো টুকরো করে আগুন ধরিয়ে দেন। জয় বাংলা শ্লোগান দেন। এসময় হাজার হাজার জনতা ছুটে আসে। তিনি বাংলাদেশকে গভীর ভাবে ভালবাসতেন। বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা নির্মাণে অনন্য ভূমিকা রাখেন। মুক্তিযুদ্ধে নির্যাতিতা নারীদের পুণর্বাসনে সক্রিয় পদক্ষেপ নেন, বীরাঙ্গনাদের বিয়ে দেন নিজ উদ্যোগে। চিরদিন কেবল দিয়েই গেছেন, নিজের জন্য কিছুই চাননি। একটি দেশের জাতির পিতা, প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতির স্ত্রী হয়েও সহজ-সরল, সাধারণ জীবন যাপন করতেন। কোন দিন প্রচার চাননি।

তিনি বঙ্গবন্ধুকে শক্তি, সাহস, মনোবল, অনুপ্রেরণা দিয়েছেন বলেই আমরা স্বাধীনতা পেয়েছি, বঙ্গবন্ধু ‘জাতির পিতা’ হয়েছেন। বঙ্গবন্ধু জীবনে যত ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করেছেন সবটাতেই বঙ্গমাতা তাঁকে ছাঁয়ার মত সাহায্য করেছেন।ডঃ নীলিমা ইব্রাহিম বলেন,“রেণু ছিলেন নেতা মুজিবের Friend, Philosopher and Guide.”

জীবনাবসান:

১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট, এক দল নিম্নপদস্থ সেনা কর্মকর্তারা রাষ্ট্রপতির বাসভবন আক্রমণ করে শেখ মুজিবকে, তাকে, তার পরিবারের সদস্যদেরকে এবং তাঁদের ব্যক্তিগত কর্মচারীদেরকে হত্যা করে। এই হত্যাকাণ্ডের শিকার হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত আছেন ফজিলাতুন্নেছার দশ বছরের ছেলে শেখ রাসেল, তার বাকি দুই ছেলে শেখ কামাল, শেখ জামাল, পুত্রবধু সুলতানা কামাল এবং রসি জামাল, ভাই আব্দুর রব সেরনিয়াবাত, দেবর শেখ নাসের, ভাতিজা শেখ ফজলুল হক মণি এবং তার স্ত্রী আরজু মণি। সেসময় পশ্চিম জার্মানি সফরে থাকার কারণে শুধুমাত্র তার কন্যাদ্বয় শেখ হাসিনা ওয়াজেদ এবং শেখ রেহানা প্রাণরক্ষা পান।

 

উপসংহার:

জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব পরস্পর অবিচ্ছেদ্য নাম। জীবনে প্রতিষ্ঠিত হতে হলে পরিবারের সহযোগিতা বিশেষ করে স্ত্রীর অবদান অনস্বীকার্য। মুজিব ভাই থেকে  বঙ্গবন্ধু, বঙ্গবন্ধু থেকে জাতির পিতা হয়ে ওঠার পিছনে যার অবদান সবচেয়ে বেশি, তিনি হচ্ছেন বঙ্গমাতা। ফজিলাতুন্নেছার বাবা মারা যাওয়ার পরে তিন বছর বয়সে বঙ্গবন্ধুর সাথে তাঁর বিয়ে হয়। পাঁচ বছর বয়সে রেণু তাঁর মাকে হারায়। পিতা-মাতা হারা রেণু বঙ্গবন্ধু’র পিতা শেখ লুৎফর রহমান আর মাতা সায়েরা খাতুনের আদরে বঙ্গবন্ধুর অন্যান্য ভাই- বোনের সঙ্গে বড় হয়ে ওঠেন। ৭৫ এর ১৫ আগষ্ট বাঙালী জাতির জীবনে নিকষ কালো অধ্যায়। খুনী মোশতাক, খুনী জিয়া বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করে। বঙ্গমাতা সিঁড়িতে বঙ্গবন্ধুর নিথর দেহ পড়ে থাকতে দেখে ঘাতকদের বলেন,“তোমরা আমাকে এখানেই মেরে ফেল।” জীবনের মত মরণেও বঙ্গবন্ধুর সঙ্গী হলেন এই মহাপ্রাণনারী। বঙ্গমাতা সংসার, সমাজ, সন্তান প্রতিপালনের পাশাপাশি স্বাধীনতা সংগ্রাম, মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীনতার পর দেশ পুণর্গঠনে অসামান্য অবদান রেখে ইতিহাসকে যেমন সমৃদ্ধ করেছেন, ইতিহাসও তাঁকে বঙ্গমাতায় অভিষিক্ত করেছে।জাতি তাঁর কাছে কৃতজ্ঞ। এই মহীয়সী নারীর জীবনী চর্চা নতুন প্রজন্মকে দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ করবে। তিনি বিরাজ করেন বৃষ্টিভেজা জুঁইয়ের শাখায়, পূর্ণিমার আলোয়, বাইগার নদীর ঢেউয়ে পাল তোলা নৌকায়, রবীন্দ্রনাথের বইয়ের পাতায়।