প্রারম্ভিকা:
বাংলাদেশের ভূখণ্ডের
জন্মের সঙ্গে মিশে আছে ছাত্র রাজনীতি ও শিক্ষক সমাজের
গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা৷ ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, ’৫৪-র
যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন, ’৬২-র শিক্ষা কমিশনের বিরুদ্ধে
আন্দোলন, ’৬৬-র ঐতিহাসিক ৬ দফা ও ১১ দফা, ’৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান, ’৭০-এর নির্বাচন,
’৭১-এর মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীনতা অর্জনসহ প্রতিটি
ঐতিহাসিক বিজয়ের প্রেক্ষাপট তৈরি ও আন্দোলন সফল করায় তৎকালীন ছাত্রছাত্রীদের
ভূমিকা অপরিসীম৷ ২ বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঐতিহাসিক প্রক্রিয়ার এক অমোঘ পরিণতি। মুসলিম লীগের
দ্বিজাতি তত্ত্বের উপর ভিত্তি করে যে রাজনীতি ভারত উপমহাদেশে সংগঠিত হয়েছিল তারই
পরিণতিতে ভারতবর্ষ বিভক্ত হয় পাকিস্তান ও ভারত এই দু’টি রাষ্ট্রে। পাকিস্তানের
দু’টি অংশ পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে প্রধান সেতুবন্ধন ছিল ইসলাম ধর্ম।
মুসলিম ভ্রাতৃত্বের বন্ধন ছাড়া আর কোন বিষয়ে পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে মিল
ছিল না। ভাষা, সমাজ-সংস্কৃতি ও ভৌগলিক অবস্থানের সকল
বিরুদ্ধতাকে উপেক্ষা করে পাকিস্তান রাষ্ট্রটির জন্ম হয়েছিল। পাকিস্তানের এই অর্ন্ত
নিহিত দূর্বলতা পরবর্তীকালে উত্তরোত্তর প্রকট হয়ে পড়ে। পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয়
কাঠামোর মধ্যে পূর্ব বাংলার স্বায়ত্তশাসনের বিষয়টি সম্পূর্ণভাবে উপেক্ষিত হয়েছিল।
এরই ফলশ্রুতিতে বাঙালি জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের অনিবার্য ধারায় এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের
মধ্য দিয়ে অভ্যুদয় ঘটে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের। আমাদের একটি গৌরবোজ্জল অতীত
আছে। সে ইতিহাস মাথা উঁচু করে দাঁড়াবার ইতিহাস। পশ্চিমে ভাগিরথী ও করতোয়া নদী,
পূর্বে ব্রহ্মপুত্র ও মেঘনা, উত্তরে
ব্রহ্মপুত্র এবং দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর-এই বিস্তীর্ণ ভু-খন্ড নিয়ে প্রাচীন বঙ্গরাজ্য
গড়ে উঠেছিল। এই সম্পূর্ণ এলাকা ভগিরথীর পূর্ব তীরে কিছু অংশ বাদ দিয়ে বর্তমান
বাংলাদেশর অর্ন্তভুক্ত। ১
বাংলাদেশের অভ্যুত্থানে ছাত্র সমাজ:
আমাদের দেশের ছাত্র সমাজের
রয়েছে এক গৌরবজ্জোল ইতিহাস। দেশের ইতিহাসে প্রত্যেকটি বড় বড় আন্দোলন ও সংগ্রামে
ছাত্র সমাজের রয়েছে স্বতঃস্ফ‚র্ত অংশগ্রহণ। ’৫২ এর ভাষা আন্দোলন, ’৬২ এর শিক্ষা আন্দোলন, ’৬৯ এর গণ আন্দোলন এর
মতো আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধে এদেশের ছাত্র সমাজ স্বেচ্ছায় অংশগ্রহণ করে এক
অভূতপূর্ব অবদান রাখে। স্বাধীনতার দাবীতে ছাত্র সমাজই মুখ্য ভূমিকা। করে জয় করে এনেছে লাল সবুজের পতাকা। মুক্তিযুদ্ধের সময় ছাত্র সমাজ
এককভাবে কোন সংগঠন বা দলের হয়ে নয় বরং সামগ্রিতভাবে বিভিন্ন আঞ্চলিক বাহিনী,
স্বেচ্ছাাসেবী সংগঠন ইত্যাদির মাধ্যমে লড়াই করেছে। এদের মধ্যে
অন্যতম হল টাঙ্গাইলের কাদেরবাহিনী, দেশের দক্ষিণ
পশ্চিমাঞ্চলের হেমায়েতবাহিনী, ময়মনসিংহ এলাকার আফসারবাহিনী
ইত্যাদি। আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধে ছাত্র সমাজের সক্রিয় অংশগ্রহণ শুরু হয়
আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাধীনতার ঘোষণার পূর্ব থেকেই। দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ,
প্রাচ্যের অক্সফোর্ড খ্যাত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এর
আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়। ২ মার্চ, ১৯৭১ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের
এক ছাত্র সভায় দেশের পতাকা প্রথম উত্তোলনের মাধ্যমে এই মহান আন্দোলনে ছাত্র সমাজ
তাদের অগ্রণী ভূমিকার যাত্রা শুরু করে।
১৯৬৮ সালের নভেম্বরে ছাত্র
অসন্তোষকে কেন্দ্র করে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খানের স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে
যে আন্দোলনের সূত্রপাত হয়, তা দ্রুত ছড়িয়ে পরে শহর এবং গ্রামের শ্রমিক-কৃষক ও নিম্ন-আয়ের পেশাজীবীসহ বিপুল সংখ্যক
সাধারণ মানুষের মধ্যে ৷ আইয়ুব খানের পদত্যাগ এর দাবী তুলে পাকিস্তানের সকল অংশের
মানুষ একযোগে পথে নামেন। তবে শিল্পাঞ্চলের শ্রমিক এবং সাধারণভাবে নিম্ন ও মধ্য আয়ের
পেশাজীবীদের মধ্যে আন্দোলন ক্রমশ সংগ্রামের রূপ নিতে থাকে। পাকিস্তানি
রাষ্ট্রকাঠামোয় পূর্ববাংলার জাতিগত নিপীড়ন ও বঞ্চনা এবং তার বিপরীতে ১৯৫২ সালের
ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে স্বায়ত্তশাসনের সংগ্রামসহ পরবর্তী বিভিন্ন পর্যায়ে গড়ে ওঠা স্বকীয় সত্তার বোধ ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান সৃষ্টিতে প্রত্যক্ষ
প্রভাব রেখেছিল ৷ ৮
২৫ মার্চ ১৯৭১ এর কালো রাত্রে
পাকিস্তানী বাহিনী তাদের নিধনযজ্ঞ কর্মকান্ড এর মাধ্যমে এদেশের জনগনের কন্ঠস্বর
স্তদ্ধ করতে চায়। দেশের আপামর জনসাধারণ তখন এক ভয়ংকর পরিস্থিতির মধ্যে দিনযাপন করতে
থাকে। প্রত্যেকে তখন তার নিজ নিজ নিরাপদ আশ্রয়
খুঁজতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। দেশের এই সংকটকালীন সময়ে ছাত্র সমাজ এককভাবে সংগঠিত না হয়ে
বরং বিভিন্ন বাহিনীর ভিতর ঢুকে তাদের সর্বোচ্চ সাধ্যমত প্রতিরোধ আন্দোলন গড়ে
তোলে। ৫ স্বাধীনতার
যুদ্ধে দখলদার পাকিস্তানীদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ আন্দোলনের জন্য দেশের সমগ্র
অঞ্চলকে কয়েকটি সেক্টরে ভাগ করা হয়। এছাড়া আঞ্চলিক কিছু বাহিনীসহ সমগ্র জাতি
বিভিন্নভাবে এই মহান আন্দোলনের সাথে সম্পৃক্ত হয়। ঢাকা শহর ছিল ২নং সেক্টরের অধীন।
স্বাধীনতা যুদ্ধে ঢাকা শহরে ছাত্রদের গেরিলা আক্রমণ ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
বাংলাদেশে প্রবেশের জন্য গেরিলারা সাধারণত কুমিল্লা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া
সীমান্ত ব্যবহার করত। ঢাকার গেরিলা আক্রমণ পরিচালনা করা হত “ক্র্যাক প্লাটুন” নামক
গেরিলা গ্রæপের মাধ্যমে। এই আক্রমণের মূল কাজ ছিল ছোট ছোট
গ্রæপে বিভক্ত হয়ে পাকিস্তানী বাহিনীর মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি
করা, যাতে করে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় নিয়ন্ত্রণের
দায়িত্বে থাকা দখলদার বাহিনীকে সহজেই ঘায়েল করা যায়। ৯ জুন ১৯৭১ তৎকালীন
ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলে (বর্তমানে শেরাটন হোটেল) প্রথম বিষ্ফোরণ ঘটানোর মাধ্যমে
এই আক্রমণের সূচনা করা হয়। ৫
এরপর একে একে গেরিলা অভিযান
পরিচালনা করা হয় যথাক্রমে ফার্মগেটের আর্মি চেকপোস্টে, আসাদ গেট এলাকায়, পাকিস্তানী ন্যাশনাল ওয়েল এর
পেট্রোল পাম্পে, তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানী প্রাক্তন
গভর্ণরের বাসভবনে, সিদ্ধিরগঞ্জ বিদ্যুৎ কেন্দ্রে, গুল টেক্সটাইল মিলে, মগবাজার ওয়ারলেস সেন্টার
তথা টিএন্ডটি কলেজে। অধিকাংশ অভিযানে গেরিলা যোদ্ধারা গ্রেনেড বিস্ফোরণ এর পর
অতর্কিত গুলিবর্ষণ করতে করতে পাক সেনাদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। এ সকল অভিযানে
পাকিস্তানী বাহিনী মানসিকভাবে ভেঙ্গে পড়ে। অরদিকে দেশপ্রেমিক জনতা ও
মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে যুদ্ধে জয়ী হওয়ার অনুপ্রেরণা বহুগুনে বৃদ্ধি পায়।
স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী পরিষদের
অন্যান্য শীর্ষ নেতাদের মধ্যে যারা বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ
অবদান রেখেছিলেন তাঁরা হলেন, যথাক্রমে '৭১র ২ মার্চ স্বাধীন বাংলার প্রথম পতাকা উত্তোলক ঐ সময়ের ডাকসুর ভিপি
জনাব আ.স.ম আবদুর রব, এবং অপর শীর্ষ নেতা জনাব শাজাহান
সিরাজ। ৬ যিনি ১৯৭১ সালের ৩ মার্চ ছাত্রলীগের
একক সংগঠনের ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের পক্ষে পল্টনের জনসভায় প্রধান অতিথি বঙ্গবন্ধু
শেখ মুজিবুর রহমানের উপস্থিতিতে স্বাধীন বাংলার ইশতেহার পাঠ করেন। এটাই ছিল
বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণার প্রথম আনুষ্ঠানিক লিখিত দলিল। এই সভায় বঙ্গবন্ধু
তাঁর সংক্ষিপ্ত ভাষণে অসহযোগ আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার নির্দেশনা দিলেন এবং তিনি ৭
মার্চ তাঁর ভাষণে বিস্তারিত বলবেন বলে ঘোষণা দিলেন।
উল্লেখিত স্বাধীন বাংলা
বিপ্লবী পরিষদের চিন্তা চেতনার সাথে ছাত্রলীগের শীর্ষনেতা শেখ ফজলুল হক মনির
চিন্তা-চেতনার সাথে ঐকমত্য না হলেও বাংলাদেশ লিবারেশন ফোর্স বা বিএলএফ গঠনের
ব্যাপারে তাদের মধ্যে ঐক্য প্রতিষ্ঠিত হয়। ফলে বঙ্গবন্ধুর একচ্ছত্র নেতৃত্বে
বিশ্বাসী ছাত্র নেতৃবৃন্দ ভারতে গিয়েও বাঙালি সেনাবাহিনী এবং অস্থায়ী সরকারের
নেতৃত্বাধীন স্বাধীনতা যুদ্ধের জন্য গঠিত মুক্তিযোদ্ধা হতে চাননি। তারা
বঙ্গবন্ধুর নির্দেশিত গেরিলা যুদ্ধের মাধ্যমে বাংলাদেশকে স্বাধীন করার চিন্তায়
আচ্ছন্ন ছিলেন। ফলে ভারতে গিয়ে তাঁরা ভারতের গোয়েন্দা সংস্থার অধিনায়ক মেজর
জেনারেল উবানের নেতৃত্বে গেরিলা ট্রেনিং শুরু করেন এবং শেখ ফজলুল হক মনির সাথে
আলোচনায় একটি বিষয়ে সিরাজুল আলম খান, আব্দুর
রাজ্জাক এবং তোফায়েল আহমেদ প্রমুখ শীর্ষ ছাত্রনেতা একমত হন যে, এখন থেকে বিএলএফ'র নাম পরিবর্তন করে নামকরণ
করা হবে মুজিব বাহিনী চার শীর্ষ ছাত্রলীগ নেতাকে মুজিব বাহিনীর আঞ্চলিক অধিনায়ক
করা হয়। এঁরা হচ্ছেন যথাক্রমে: (১) শেখ ফজলুল হক মনি (২) সিরাজুল আলম খান,
(৩) আব্দুর রাজ্জাক এবং (৪) তোফায়েল আহমেদ। মুজিব বাহিনীতে
বেশির ভাগই ছাত্রলীগের কর্মীদের বাছাই করা হয়। এবং সে সময় ভারত সরকার কর্তৃক
মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে চার আঞ্চলিক অধিনায়ককে লেঃ জেনারেল এর মর্যাদা ও প্রটোকল
দেয়া হয়েছিল।
মহাত্মা গান্ধী
বলেছেন- "The Students are the future leaders of the country who could fulfill
country's hopes being capable." ৩ উপমহাদেশীয়
রাজনীতির অঙ্গনের একটা বড় জায়গা দখল করে আছে ছাত্ররা। এ অঞ্চলের বড় বড় আন্দোলন,
মুক্তিসংগ্রামগুলোর পরিচালনা করেছে মূলত ছাত্ররাই। যখনই কোনো
অন্যায় মাথাচাড়া দিয়ে ওঠার চেষ্টা করেছে তখনই দেশ ও জাতির স্বার্থে ছাত্ররাই
প্রতিবাদে মুখর হয়েছে। আজকের বাংলাদেশ গঠনের পেছনে সর্বাধিক ভূমিকা রেখেছে এ দেশের
ছাত্ররাই। ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে পাকিস্তানি স্বৈরশাসকের বিরুদ্ধে
একের পর এক প্রতিবাদ ভাষা আন্দোলন, গণ-অভ্যুত্থান,
সর্বোপরি ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশের
জন্মের পেছনে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছে ছাত্রসমাজ। যদিও বর্তমানে ছাত্র রাজনীতি
ব্যাপকভাবে সমালোচিত হচ্ছে তবু ইতিহাসে এর অবদান অস্বীকার করার উপায় নেই।
বাংলাদেশের অভ্যুত্থানে শিক্ষক সমাজ:
ইয়াহিয়া খান
ক্ষমতায় এসে একইভাবে স্বৈরশাসন কায়েম করলে একইভাবে বুদ্ধিজীবীরা প্রতিবাদ জানান।
একাত্তরের অসহযোগ আন্দোলনকালীন তাঁরা রাজনীতিবিদ ও আন্দোলনকারীদের সঙ্গে থেকে কাজ
করেন। ১৯৭১ সালে যখন গণহত্যা শুরু হয় তখন বাংলাদেশের মানুষের মনে সবচেয়ে বেশি
মর্মান্তিকভাবে বেজেছে বিশ^বিদ্যালয়ে হত্যাকাণ্ড। দেশে-বিদেশে
বাংলাদেশের মানুষ যে যেখানে ছিল এ ঘটনার পর নিশ্চিত জেনেছে যে, পূর্ণ স্বাধীনতা ছাড়া কোনো বাঙালির বাঁচার উপায় নেই। বুদ্ধিজীবীদের বড়ো
অংশ তাই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন। ভারতে আশ্রয় নেওয়া
বুদ্ধিজীবীরা গড়ে তুলেন ‘বাংলাদেশ শিক্ষক সমিতি’, যার
সভাপতি ছিলেন ড. আজিজুর রহমান মল্লিক (ভি. সি. চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়)। এছাড়া
তাঁকে সভাপতি এবং জহির রায়হানকে সাধারণ সম্পাদক করে গঠিত হয় ‘বুদ্ধিজীবী সংগ্রাম
পরিষদ’। বুদ্ধিজীবীদের সংগঠন মুজিবনগর সরকারের অধীনে পরিকল্পনা সেল গঠন করে।
বিশ্বে বুদ্ধিজীবীদের কাছে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের তথ্য সরবরাহ ও বিভিন্ন দেশের
বিশ^বিদ্যালয়, সংসদীয় পার্টির
সঙ্গে সাক্ষাৎ, সাহায্যের আবেদন, বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ফোরামে বক্তব্য প্রদান, শরণার্থীদের
উৎসাহ প্রদান ইত্যাদি ক্ষেত্রে তাঁরা ভূমিকা রাখেন। শরণার্থী শিবির শিক্ষক সমিতির
উদ্যোগে ৫৬টি স্কুল খুলে শরণার্থীদের ছেলেমেয়েদের শিক্ষাদানের ব্যবস্থা করেন।
বাঙালি বুদ্ধিজীবী ও শিক্ষার্থীদের সমন্বয়ে গঠিত হয় ‘স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র’,
যা বাঙালি মুক্তিযোদ্ধা ও স্বাধীনতাকামীদের প্রেরণার উৎস ছিল।
এভাবে বিভিন্ন পর্যায়ে বাঙালি শিক্ষকরা মুক্তিযুদ্ধে
অবদান রাখেন। ৪
বাংলাদেশের
মুক্তিযুদ্ধের পটভূমি সৃষ্টি এবং নয় মাসের মুক্তিযুদ্ধে বুদ্ধিজীবীদের অবদান ছিল
অপরিসীম। পাকিস্তান সৃষ্টির কয়েক মাসের মধ্যেই মুসলিম লীগের পাকিস্তান
জাতীয়তাবাদের বদলে বাঙালিরা ভাষা আন্দোলনকেন্দ্রিক বাঙালি জাতীয়তাবাদে উদ্বুদ্ধ
হয়। আর এর পেছনে মূল প্রেরণা জোগান ছাত্র ও বুদ্ধিজীবী সম্প্রদায়। তাঁরা বাহান্নর
ভাষা আন্দোলন থেকে ষাটের দশকে স্বায়ত্তশাসন আন্দোলন ও একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে
বিভিন্নভাবে ভূমিকা রাখেন। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে বিশ্ববিদ্যালয় বিশেষ করে ঢাকা
বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি বড়ো ভূমিকা ছিল। এ কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও ছাত্ররা
ছিল পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর মূল লক্ষ্যবস্তু। যদিও নয় মাস শুধু
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নয়, সমগ্র বুদ্ধিজীবী সম্প্রদায়ের প্রতি
তাদের আক্রোশ ছিল এবং এ কারণে পরিকল্পিতভাবে এ সম্প্রদায়কে নিধনের সিদ্ধান্ত নেয়।
অনেকাংশে তারা সফলও হয়। যদিও ১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ায়
তাদের পরিকল্পনার পরিপূর্ণ বাস্তবায়ন হয়নি।
বাংলাদেশ শিক্ষক
সমিতি মুক্তিযুদ্ধের প্রথম দিকে ভারতে আশ্রয়গ্রহণকারী বিশেষ করে, কলকাতা ও পশ্চিমবঙ্গে এবং আগরতলা ও ত্রিপুরায় আশ্রয় নেওয়া প্রাথমিক
থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত সব স্তরের শরণার্থী শিক্ষকদের নিয়ে সংগঠিত হয়।
মুক্তিযুদ্ধের নয় মাসব্যাপী সংগঠনটি সহায়কশক্তি হিসেবে নানা ক্ষেত্রে কাজ করে
মুক্তিযুদ্ধে অসামান্য অবদান রাখে। মুক্তিযুদ্ধের সময় কলকাতা ও পশ্চিমবঙ্গে এবং
আগরতলা ও ত্রিপুরায় অনেক মানুষ পূর্ববাংলা থেকে আশ্রয় নিয়েছিলেন। পশ্চিমবঙ্গেই এই
সংখ্যা দাঁড়িয়েছিল এক কোটির মতো। ভারত সরকার এদের শরণার্থী শিবিরে আশ্রয় দেয়;
খাদ্য, চিকিৎসা ও শিশু-নারীদের বিশেষ
পরিচর্চার ব্যবস্থা করে। উদ্বাস্তু ভরণ-পোষণের জন্য ভারত সরকার জনগণের ওপর বিশেষ
কর ধার্য করে। মানবিকতার স্বার্থে ভারতীয় জনগণ তা ধৈর্যের সঙ্গে বহন করে। এই কোটি
শরণার্থীর মধ্যে শিক্ষকদের সংখ্যাও ছিল উল্লেখযোগ্য, প্রাথমিক
থেকে বিশ্ববিদ্যালয় স্তর পর্যন্ত। প্রবাসী শিক্ষক নেতারা অনুভব করলেন যে শিক্ষকদের
দেখভাল করার জন্য প্রবাসী শিক্ষকদের একটি সমিতি গঠন করা প্রয়োজন।৭
তাই বাংলাদেশের
মুক্তিযুদ্ধে সহায়ক শক্তি হিসেবে কাজ করার লক্ষ্যে এবং আমাদের যুদ্ধের স্বপক্ষে
বিশ্ববাসীর সমর্থন আদায়ের উদ্দেশ্যে উদ্বাস্তু শিক্ষক ও বুদ্ধিজীবীরা ২১ মে ১৯৭১
‘বাংলাদেশ শিক্ষক সমিতি’র ব্যানারে নিজেদের সংগঠিত করে তুললেন। সেদিন বেলা ১১টার
দিকে প্রবাসী শিক্ষকেরা কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ভবন দ্বারভাঙা ভবনের
সামনে সমবেত হয়ে এ সমিতি গঠন করেন। সমিতির নির্বাচিত কার্যকরী সংসদ ছিল এ রকম:
সভাপতি ড. আজিজুর রহমান মল্লিক, কার্যকরী সভাপতি কামরুজ্জামান,
কোষাধ্যক্ষ ড. খান সারওয়ার মুরশিদ, সাধারণ
সম্পাদক ড. অজয় রায়, সহকারী সম্পাদক আনোয়ারুজ্জামান ও
গোলাম মুরশিদ।
বাংলাদেশ শিক্ষক সমিতি গঠনের পেছনে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়
বাংলাদেশ সহায়ক সমিতির—বিশেষ করে সাধারণ
সম্পাদক দিলীপ চক্রবর্তী ও অন্য দুই শিক্ষকের অনিরুদ্ধ রায় ও অনিল সরকারের—উৎসাহও
ছিল প্রবল। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশ সহায়ক সমিতি বাংলাদেশ শিক্ষক সমিতিকে ৩০০
টাকা অনুদান দিয়ে প্রাথমিকভাবে তহবিল খুলতে সাহায্য করে। সমিতি পরে ভারত ও
বাংলাদেশের আরও অনেক প্রতিষ্ঠানের অর্থানুকূল্য পেয়েছিল।
বিশ্ববিদ্যালয়ের
প্রবাসী শিক্ষকেরা মুক্তিযুদ্ধের সহায়ক শক্তি হিসেবে কয়েকটি সংগঠন স্থাপনে
উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখেন। তার মধ্যে একটি ছিল বাংলাদেশ সরকারের অধীনে একটি
পরিকল্পনা সেল। এটি প্রতিষ্ঠায় অর্থনীতিবিদ রেহমান সোবহান, এস আর বোস, মোশাররফ হোসেন ও সনৎকুমার সাহা;
পরিসংখ্যানবিদ ওয়াহিদুল হক, ড. খান সারওয়ার
মুরশিদ, ড. আনিসুজ্জামান, ড. অজয়
রায়, মতিলাল পাল সক্রিয় ভূমিকা রেখেছিলেন।
সে সময় সম্ভবত পরিকল্পনা সেলের প্রধান ছিলেন প্রধানমন্ত্রী
স্বয়ং। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ড. মুজাফফর আহমদ চৌধুরী মুজিবনগরে
এলে পরিকল্পনা সেলের সভাপতি নিযুক্ত হন। পরে ড. চৌধুরীর অনুরোধে আমি বাংলাদেশ
সরকারের নির্দেশে পরিকল্পনা সেলে সাম্মানিক পূর্ণ সদস্য হিসেবে যোগ দিই। আমার ওপর
দায়িত্ব ছিল মূলত চেয়ারম্যানের সচিব হিসেবে কাজ করা এবং শিক্ষা বিশেষ করে
বিজ্ঞানশিক্ষার দিকগুলো দেখাশোনা করা। পরিকল্পনা সেল কিছুদিন পরেই পূর্ণাঙ্গ
পরিকল্পনা কমিশনে পরিণত হয়।
বাংলাদেশ শিক্ষক
সমিতি নানা কর্মসূচি ও কার্যক্রম হাতে নিয়েছিল। যেমন: ক. সাধ্যমতো শরণার্থী
শিক্ষকদের পুনর্বাসন ও মুক্তিযোদ্ধাদের নানাভাবে সহায়তা দান; খ. মুক্তিযুদ্ধের জন্য বস্তুগত সহযোগিতা ও মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য
শীতবস্ত্রসহ পোশাক, জুতা ইত্যাদি সংগ্রহ ও বিতরণ; এখানে উল্লেখ্য, বাংলাদেশের
স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীরা ও শরণার্থী নারীরা মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য সোয়েটার
ও মোজা বুননের যে প্রকল্প নিয়েছিল, কারিগরদের মজুরিসহ
সেটির অর্থায়ন সমিতি করেছে; গ. ভারতসহ দেশে-বিদেশে
মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে প্রচারণা ও জনমত গড়ে তোলা; ঘ. প্রচার ও মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধে সহায়তা করা; ঙ. মুক্তিযুদ্ধ ও বাংলাদেশ সম্পর্কিত পুস্তিকা প্রকাশ করা।
বাংলাদেশ ও মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপট ও অনিবার্যতা ব্যাখ্যা করে
বাংলাদেশ শিক্ষক সমিতির সভাপতি ও সম্পাদকের আমাদের মুক্তিযুদ্ধের প্রতি সমর্থন,
সাহায্য ও স্বীকৃতি জানানোর আহ্বান জাতিসংঘ বিশ্ববরেণ্য
ব্যক্তিদের ও বিশ্বের বিভিন্ন শিক্ষক সমিতির কাছে পাঠায় এবং বিভিন্ন স্থানে ও দেশে
অব্যাহত প্রচারণা চালাতে থাকে।
যবনিকা:
শুধুমাত্র
মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়েই কেবল বাঙালি তার জাতিসত্তাকে খুঁজে পায়নি। তাদের
মুক্তিসংগ্রামের ইতিহাস সুদীর্ঘ কালের। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে মধ্য দিয়ে
এদেশের ছাত্র সমাজই প্রথম সত্যিকারভাবে অনুধাবন করে যে, পাকিস্তানিরা ভিন্ন জাতিসত্তার অধিকারী হবার কারণে তাদের সাথে
বাঙালিদের সহাবস্থান অসম্ভব। পূর্ববাংলার ছাত্র ও শিক্ষক সমাজ
তাঁদের আন্দোলনের মধ্যদিয়ে সত্যকে অনুধাবন করেছেন এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক সংগ্রাম ও
আন্দোলনের মধ্য দিয়ে এদেশের বৃহত্তর জনসাধারণের মাঝে তা সঞ্চারিত করেছিল। তাঁদের
নিরন্তর প্রচেষ্টার মাধ্যমেই এদেশের মানুষ তাদের ওপর পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর
চাপিয়ে দেয়া নানা প্রকার ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ ও আন্দোলনে উদ্বুদ্ধ
হয়। ৬ আর বাঙালি জাতি তাদের অধিকার প্রতিষ্ঠার
ব্যাপারে ক্রমাগত সংঘবদ্ধ হতে থাকে। বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ এ জাতির বিভিন্ন
দুঃসময়ে যে একত্র ও সংঘবদ্ধ হতে পেরেছিল তার মূল প্রেরণাই ছিল এদেশের গর্বিত ছাত্র
ও শিক্ষক সমাজ।
রেফারেন্সসমূহ:
১। সিভিক এডুকেশন-২, বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়। পৃষ্ঠা ৪২-৪৪।
২। https://www.dw.com/bn/ দুর্লভ-ছবিতে-বাংলাদেশে-ছাত্র-আন্দোলনের-ইতিহাস/g-42244030। (দেখা
হয়েছে, ১১ ফ্রেব্রুয়ারি ২০২১)
৩। https://www.facebook.com/722100911284716/posts/923663281128477/ (দেখা
হয়েছে, ১০ ফ্রেব্রুয়ারি ২০২১)
৪। সচিত্র বাংলাদেশ, ডিসেম্বর ২০২০ সংখ্যা। পৃষ্ঠা ৯-১১।
৫। https://bdsocialnews.com/603/ (দেখা হয়েছে, ১২ ফ্রেব্রুয়ারি ২০২১)
৬।https://www.djanata.com/index.php?ref=MjBfMDZfMjdfMThfMV80XzFfMjE2ODcy
(দেখা হয়েছে, ১৬ ফ্রেব্রুয়ারি ২০২১)
৭। https://www.prothomalo.com/special-supplement/মুক্তিযুদ্ধ-ও-বাংলাদেশ-শিক্ষক-সমিতি
(দেখা হয়েছে, ১৪ ফ্রেব্রুয়ারি ২০২১)
৮। https://bn.wikipedia.org/wiki/ঊনসত্তরের_গণঅভ্যুত্থান (দেখা হয়েছে, ১৬ ফ্রেব্রুয়ারি ২০২১)